Skip to content
Mimangsha
Article

When Human Beings Become Commodities

Modern consumer culture increasingly shapes our identity, relationships, and values. Drawing on the ideas of Egyptian thinker Abd al-Wahhab al-Masiri, this article explores how human beings risk becoming commodities in a world dominated by materialism.

আবদুল ওয়াহহাব আল-মাসিরির ‘আল-ইনসান ওয়াশ-শাই’ (الإنسان والشيء) ভাবনার আলোকে

মানুষ কি কেবলই এক জৈবিক কাঠামো—যার অস্তিত্ব শুধুই খাওয়া, পরা, ঘুমানো আর ভোগের চক্রে সীমাবদ্ধ? নাকি মানুষের ভেতরে এমন কোনো গভীর তাৎপর্য রয়েছে, যা নিছক বস্তুগত চাহিদার সীমানাকে ছাপিয়ে যায়?

আধুনিক সভ্যতার চোখধাঁধানো অগ্রগতির সামনে দাঁড়িয়ে এই প্রশ্নটি আজ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। প্রযুক্তি, উৎপাদন, যোগাযোগ ও ভোগবাদী সক্ষমতায় মানুষ আজ ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে এগিয়ে। তবে এই অগ্রযাত্রার সমান্তরালে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নও জোরালো হচ্ছে—মানুষের আত্মমর্যাদা, নৈতিক মূল্যবোধ ও পারস্পরিক সম্পর্কের উষ্ণতা কতটুকু অবশিষ্ট রইল?

প্রখ্যাত মিশরীয় চিন্তাবিদ ড. আবদুল ওয়াহহাব আল-মাসিরি তাঁর চিন্তাজাগানিয়া প্রবন্ধ ‘আল-ইনসান ওয়াশ-শাই’ (মানুষ ও বস্তু)-তে ঠিক এই সংকটটিকেই চিহ্নিত করেছেন। তাঁর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হলো আধুনিক সমাজে মানুষের ‘বস্তুতে রূপান্তর’ (Reification)—এমন এক প্রক্রিয়া, যেখানে মানুষের আত্মিক সত্তার চেয়ে তার উপযোগিতা, উৎপাদনক্ষমতা ও ভোগের সামর্থ্যই হয়ে ওঠে মূল পরিচায়ক।

মানুষ যখন বিজ্ঞাপনের জীবন্ত বিলবোর্ড

একটি সাধারণ পোশাকের কথাই বিবেচনা করা যাক। পোশাকের প্রাথমিক কাজ শরীরের সুরক্ষা এবং ব্যক্তিসৌন্দর্য ও সংস্কৃতির প্রকাশ। তবে বাজারকেন্দ্রিক সমাজ পোশাকে যুক্ত করেছে এক নতুন মাত্রা—বিজ্ঞাপন।

যখন একজন ব্যক্তি কোনো বহুজাতিক ব্র্যান্ডের লোগো বা প্রতীকযুক্ত পোশাক গায়ে চাপান, তখন তিনি অজান্তেই সেই প্রতিষ্ঠানের চলমান প্রচারযন্ত্রে পরিণত হন। সংকটটি স্রেফ লোগো বহন করার মধ্যে নয়; গভীরতর সংকট হলো—মানুষের রুচি, নান্দনিকতা ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা যখন সম্পূর্ণরূপে বাজারের তৈরি করা কৃত্রিম চাহিদার কাছে বন্দি হয়ে পড়ে, তখন তার নিজস্ব স্বকীয়তার আর কী-ই বা অবশিষ্ট থাকে? আল-মাসিরির বস্তুবাদী সভ্যতার সমালোচনা মূলত এই জায়গাটাতেই আঘাত করে।

দ্রুতগতির জীবন ও সম্পর্কের শৈথিল্য

একসময় পরিবারের সদস্যদের একসঙ্গে খাবারের টেবিলে বসা ছিল দৈনন্দিন জীবনের এক অলিখিত কিন্তু গভীর নিয়ম। খাবারের টেবিল কেবল ক্ষুধা মেটানোর জায়গা ছিল না; তা ছিল দিনের ক্লান্তি ভুলে গল্প করা, আবেগ ভাগাভাগি এবং সম্পর্ক ঝালিয়ে নেওয়ার এক মানবিক মিলনমেলা।

অথচ আধুনিক জীবনের চরম ব্যস্ততায় খাবার গ্রহণ অনেক সময় কেবল শরীরে শক্তি সরবরাহের এক যান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। ফাস্টফুড কিংবা তৈরি খাবারে কোনো মৌলিক অন্যায় নেই, বাস্তবতার নিরিখে এগুলোর উপযোগিতাও রয়েছে। তবে উৎকণ্ঠার জায়গা হলো—জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে যখন ‘সময় বাঁচানো’, ‘গতি’ ও ‘সর্বোচ্চ কার্যকারিতা’ অর্জনই প্রধান মাপকাঠি হয়ে ওঠে, তখন পারস্পরিক সান্নিধ্য ও অনুভূতির জায়গাগুলো সংকুচিত হতে বাধ্য। মানুষ কেবল খাদ্য গ্রহণকারী যন্ত্র নয়; মানুষের অস্তিত্ব টিকে থাকে সহমর্মিতা, আন্তরিক আলাপ এবং একে অপরকে সময় দেওয়ার ওপর।

জনপ্রিয়তা কি প্রজ্ঞার সমার্থক?

আধুনিক গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এক অদ্ভুত প্রবণতা হলো—যাঁরা জনপ্রিয়, তাঁদের কথাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়। কোনো চলচ্চিত্র তারকা, সংগীতশিল্পী বা বিনোদনজগতের মুখ যখন নৈতিকতা, মানবিক সম্পর্ক কিংবা জীবনদর্শন নিয়ে কথা বলেন, তখন বিপুল জনতা তা দ্বিধাহীনভাবে অনুসরণ করে।

অথচ জনপ্রিয়তা এবং প্রজ্ঞা সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বিষয়। একজন ব্যক্তি তাঁর নিজস্ব কর্মক্ষেত্রে অসামান্য সফল হতে পারেন; কিন্তু সেই সাফল্য তাঁকে দর্শন কিংবা মানবজীবনের জটিল প্রশ্নগুলোর বিশেষজ্ঞ বানিয়ে দেয় না। আল-মাসিরি সতর্ক করেছেন এই বলে যে, সমাজ যখন খ্যাতির চাকচিক্যকে জ্ঞানের বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করে, তখন সামগ্রিক চিন্তার মানদণ্ডই বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। কথার যৌক্তিকতা ও নৈতিক ভিত্তি যাচাইয়ের চেয়ে বক্তার জনপ্রিয় মুখটিই তখন সর্বজনীন সত্যের মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়।

ক্রীড়াঙ্গন: মানবিক বিকাশ নাকি শুধুই বাণিজ্যিক লড়াই?

খেলাধুলা মানুষের শারীরিক বিকাশ, দলগত সংহতি, শৃঙ্খলা ও নির্মল আনন্দের এক চমৎকার মাধ্যম। প্রতিযোগিতায় জয়ের আকাঙ্ক্ষা স্বাভাবিক হলেও জয়ই যখন একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়, তখন সৌহার্দ্য, প্রতিপক্ষের প্রতি শ্রদ্ধা এবং খেলার মূল আনন্দ হারিয়ে যায়।

বর্তমান পেশাদার ক্রীড়াবিশ্বে বিপুল অর্থের লেনদেন, স্পনসরশিপ ও খেলোয়াড় কেনাবেচা এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। পেশাদারিত্বের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিজে থেকে অমানবিক নয়; সংকট তৈরি হয় তখনই, যখন একজন খেলোয়াড়ের ব্যক্তিত্ব, মানবিক মর্যাদা ও স্বাধীনতাকে ছাপিয়ে তাঁর ‘বাজারমূল্য’ প্রধান হয়ে ওঠে। মানুষ তখন কেবল সংখ্যামূলক পারফরম্যান্স ও বাণিজ্যিক মুনাফার এক উপকরণে পর্যবসিত হয়।

সভ্যতার অগ্রগতি মাপার মাপকাঠি কী?

আধুনিক জীবনের বৈজ্ঞানিক সুযোগ-সুবিধা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নতি, জীবনযাত্রার স্বস্তি ও যোগাযোগের নতুন দিগন্ত নিঃসন্দেহে মানবজাতির বড় প্রাপ্তি। তবে কোনো সভ্যতার সত্যিকারের উৎকর্ষ কেবল উৎপাদন, গতি, মুনাফা কিংবা ভোগের প্রাচুর্য দিয়ে বিচার করা যায় না।

একটি সমাজের আসল মান যাচাই করতে হলে কিছু মৌলিক প্রশ্ন করা জরুরি:

  • সেই সমাজে দুর্বল ও সাধারণ মানুষের মানবিক মর্যাদা কতটা সুরক্ষিত?
  • পারিবারিক বন্ধন ও সামাজিক সম্পর্কের মধ্যে কতটা আন্তরিকতা অবশিষ্ট রয়েছে?
  • নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের অবস্থান সেখানে কোথায়?
  • সর্বোপরি, মানুষ কি সেখানে নিজের জীবনের গভীরতর অর্থ ও উদ্দেশ্য নিয়ে ভাবার অবসর পায়?

ইসলামী জীবনদর্শনে মানুষের মূল্যায়ন কেবল তার বৈষয়িক সম্পদ, ক্ষমতা কিংবা সামাজিক প্রতিপত্তি দিয়ে হয় না। মানুষ একটি দায়িত্বশীল ও নৈতিক সত্তা, যার অস্তিত্বের সার্থকতা বস্তুগত ভোগের সীমানার চেয়ে অনেক ঊর্ধ্বে। আল-মাসিরির দর্শন আমাদের সেই হারানো মানবিক বোধ ও আধ্যাত্মিক দিগন্তের দিকেই দৃষ্টি ফেরাতে বলে।

উপসংহার

আধুনিক সভ্যতার সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি সম্ভবত প্রযুক্তি কতটা এগিয়েছে তা নয়; বরং এই বিপুল বস্তুগত অগ্রগতির মাঝে মানুষ কতটা ‘মানুষ’ থাকতে পেরেছে।

আমরা কি বাজার ও প্রযুক্তিকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করছি, নাকি নিজেরাই ধীরে ধীরে বাজার ও প্রযুক্তির চাহিদামতো বদলে নিচ্ছি নিজেদের স্বভাব, আবেগ ও অস্তিত্বকে? এই আত্মসমালোচনাই হতে পারে একটি মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন সমাজ পুনর্নির্মাণের প্রথম সূচনা।

মূল চিন্তার উৎস: ড. আবদুল ওয়াহহাব আল-মাসিরি (عبد الوهاب المسيري)

মূল প্রবন্ধ: الإنسان والشيء

প্রকাশনা: আল-জাজিরা নেট, ৩ জুলাই ২০০৮

সম্পাদকীয় তথ্য: মূল আরবি প্রবন্ধের ভাবনার আলোকে রচিত স্বতন্ত্র বাংলা আলোচনা; সরাসরি অনুবাদ নয়।